Samachar Live
সফর

চমৎকার চটকপুর

জোড়বাংলা মোড় থেকে বাঁক নিয়ে ৫০ মিটার ওপরে উঠতেই, গত তিনদিন যাবৎ দার্জিলিং এর একঘেয়ে ভীড়ভাট্টা, ট্রাফিকজ্যাম, হইচই নিমেষে ভ্যানিস হয়ে গেলো । আরো কিছুটা যেতেই রাস্তা রোধ করলো একটা তালা বন্ধ জং ধরা লোহার গেট । আমাদের গাড়ী চালক আগেই  ফরেস্ট অফিস থেকে গাড়ীতে তুলে নিয়েছিলেন চাবি হাতে মানুষ টিকে, তিনি আমাদের বুকিং আছে শুনে, কাগজ না দেখেই, খুলে দিলেন সিঞ্চল রিসার্ভ ফরেস্ট এর দরজা ।
আমরা প্রবেশ করলাম এক অনন্য সুন্দর পাহাড় জংগল এর দেশে । আমাদের সশব্দে অভ্যার্থনা জানালো ঝিঝির কোরাস । দুদিকে ঘন জংগল, কখনো বা একদিকে খাড়াই পাহাড় আর অন্যদিকে গভীর খাদ, কিন্তু জংগল সর্বত্র তার জাল বিস্তার করে বিরাজমান।
আমাদের সত্তরোর্ধ চালক জানালেন তিনি এতোদিন গাড়ী চালাচ্ছেন, কিন্তু এই রাস্তায় প্রথম গাড়ী নিয়ে এলেন ।  একসময় তিনি তাঁর বাবার সঙ্গে এখানে গরুর পাল নিয়ে চড়াতে আসতেন । চলতে চলতে তিনি চেনাতে লাগলেন নানান গাছ গাছালি, কখনো গাড়ী থামিয়ে পাতা ছিঁড়ে এনে চেনালেন শিশ্নু (পাহাড়ী বিছুটি),  চিড়োতা  আরো নানান গাছ, সেই জনমানবশূন্য এবড়োখেবড়ো অনবরত চড়াই রাস্তায় এই পাহাড়ি সরল মানুষটির সঙ্গে বেশ এগোচ্ছিলাম আরো গহিনে । ঘন্টা দেড়েক এইভাবেই চলার পর হঠাৎ রাস্তা রোধ করে দাঁড়ালো আরো একটা জংধরা তালাওয়ালা গেট । আমরা তো বটেই, চালক মহাশয়ও পড়লেন মহা বিপদে ।  তারও হয়তো জানা ছিলোনা এই বাধাটির কথা । আমি চটকপুর ফরেস্ট বাংলোর কেয়ারটেকার বিনোদ রাইজী কে ফোন করতে ব্যস্ত হলাম আর তিনি আমাদের গাড়ীতে বসিয়ে “ওয়ে ওয়ে, কোয়ি হ্যায়” চিৎকার করতে করতে নেমে গেলেন পাশের একটি খাদে
আমিও নামলাম, একটু এগিয়ে দেখি তিনি সঙ্গে করে এক নেপালি যুবককে নিয়ে উঠে আসছেন ।  সেই যুবকও আগের মতোই শুধু আমাদের বুকিং আছে শুনেই, কাগজ না দেখেই, সেই দরজার তালা খুলে দিলেন

আমরা প্রবেশ করলাম আরো গহিনে যেখানে প্রায় রাস্তা বলে আর কিছু নেই ।  এবড়োখেবড়ো পাথর ছড়ানো চড়াই, বাঁকবহুল এক জংলি পথ, যেপথে গাড়ীর গতি শামুককেও লজ্জা দেবে ।  আমরা আশ্চর্য হচ্ছিলাম এই ভেবে যে, প্রায় দুঘন্টা হয়ে গেলো আমরা চলছি, অথচ উলটোদিক থেকে এখনো পর্যন্ত একটি গাড়ীকেও আসতে দেখিনি । মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছিলো এমন একটা নিরিবিলিতে আসতে পেরে
সাতপাঁচ ভাবছি, হঠাৎ একটা বাঁক ঘুরতেই, আমার স্ত্রী আর চালক চাপা সমস্বরে বলে উঠলো ওই যে হরিণ (চালক অবশ্য মৃগ বলেছিলেন)।
চকিতে মুখ তুলে সামনে দেখি একটি বার্কিং ডিয়ার আপন খেয়ালে পাহাড়ের গা ঘেঁষে এগিয়ে চলেছে । আমি মুখ নামিয়ে ক্যামেরা রেডি করে, আবার সামনে তাকাতেই দেখি  সে আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে চকিতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে হারিয়ে গেলো ।
আমাদের চালক মহাশয় কে জিগেস করে জানতে পারলাম  সামনে কোনো বাঁকের মুখে চিতা বা ভাল্লুকের সামনা সামনি হওয়াও অস্বাভাবিক নয় এই জঙ্গলাকীর্ণ রাস্তায়, । সারাদিনে হয়তো আমাদেরটাই প্রথম আর শেষ গাড়ী বন্যদের এই আপনদেশে
আমরা অধীর আগ্রহে জঙ্গলগন্ধী পথে ঝিঁঝিঁর গান শুনতে শুনতে এগিয়ে চললাম ।  এইভাবে আরো বেশ কিছুটা চলার পর, খানিকটা সমতল মতো জায়গায় তিনমাথার একটা মোড়ে এসে আমাদের চালক আবার দ্বিধায় পড়লেন ।  তিনি নেমে পরলেন,  এখানে চারদিকে “গুঁড়াস” এর আধিক্য দেখিয়ে তিনি বললেন –

“এপ্রিল মে তে এলে এই সবুজ জঙ্গলে লালের হোলি দেখতে পাবেন, আপনারা যাকে রডোডেন্ড্রন বলেন । চারিদিকে বাশঁঝাড়ের উপদ্রবে যা এখন বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এই জঙ্গল-পাহাড়ে, বাঁশই গুঁড়াসের শত্রু, অথচ, বনদপ্তরের এই ব্যাপারে কোনো হেলদোল নেই” ।

আমি তার কথা শোনার ফাঁকে বিনোদজী কে ফোন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম, তাকে পেতেই, তার থেকে পথের দিশা নিয়ে আমরা আবার এগিয়ে চললাম, আর মিনিট দশেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম রাস্তার শেষ প্রান্তে, স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যের রাজত্ব্য চটকপুর ইকো হাটে।
বিনোদজীর উষ্ণ অভ্যর্থনায় আমরা আপ্লুত, এবং আশ্চর্যের ব্যাপার উনিও আমাদের বুকিং এর কাগজ না দেখেই, শুধু মুখের কথাতেই আমাদের ঘরের দরজা খুলে দিয়ে আমাদের জন্যে চা আনতে চলে গেলেন ।

আমাদের গাড়ীটা চলে যেতেই, এক অপার নৈশব্দ আমাদের সঙ্গ নিলো
ঘরের ভেতরেও বেশ একটা জঙ্গল জঙ্গল ব্যাপার আছে । রেড পান্ডা, চড়াই ইত্যাদির ছবি দিয়ে ঘরটা সাজানো, সমস্ত আসবাব বাঁশ আর বেতের তৈরি ।  ঘরের পেছনদিকে কলঘরের পাশের দরজাটা খুলতেই  ‘এক বারান্দা’ সবুজ ঝিঁঝিঁ ডাকা পাহাড় হুড়মুড় করে ঢুকে পরলো একদম ঘরের ভেতরে ।
বিনোদজি গরম চা নিয়ে হাজির হয়ে বললেন, চা খেয়ে একবার ওপরে ভিউ পয়েন্ট টা ঘুরে আসুন ।
আমাদেরও যেন আর তর সইছিলো না, একে তো তিনটে দিন দার্জিলিংএ “নষ্ট” করে, এখানে মাত্র একটা দিন হাতে রাখার আফসোস কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে, তাই আর সময় নষ্ট না করে, বেরিয়ে পরলাম।
বাংলোর পেছনের পাথুরে পাকদণ্ডী ধরে উঠতে থাকলাম ।  ওপরে ছোটোখাটো সাজানো গোছানো একটা পাহাড়ি বস্তি রয়েছে । ছোটো ছোটো দর্মা বা টিনের বাড়ী গুলো এতো সুন্দর পরিপাটি যে তার থেকে চোখ ফেরানো যায়না । প্রতিটা ঘরের চারপাশ রঙবেরঙ এর ফুলগাছ দিয়ে সাজানো । আমাদের বিনোদজীর বাড়ীও এখানেই ।  নীচে ফরেস্ট বাংলোয় জায়গা না পেলে, ওনার বাড়ীতে হোম স্টের ব্যবস্থাও আছে ।  দেখতে দেখতে বেশ কিছুটা ওপরে উঠে একটা বাঁক ঘুরতেই চোখে এসে পড়লো এক ঝলক কাঞ্চনজঙ্ঘা ।

সারাটা দিন প্রকৃতির এই আপন দেশে, খোলামেলায় বেশ কাটলো ।  সন্ধ্যা নামতেই যেন এই জংলাপাহাড়ের অন্য একটা রুপ ।  চারিদিক শুনশান, আমরা আড়াই জন ছাড়া এই পৃথিবীতে যেন আর কেউ নেই ।  ঠান্ডাও একদম হাড়কাপানো,  বিনোদজীর রান্নাঘর থেকে আমাদের জন্যে গরম পকোড়া আর ধোয়া ওঠা চা এসে গেলো, আহা স্বর্গ যেন আজ এখানেই নেমে এসেছে ।
রাতে চিকেন আর গরম রুটি খাওয়া সেরে তাড়াতাড়ি ঘুমের দেশে পাড়ি জমালাম ।

ভোর চারটেয় উঠে, সেই আলোআধারি পাকদণ্ডি বেয়ে চললাম ভিউ পয়েন্ট এ । আমি ছাড়া সেখানে তখন কেউ নেই ।দুদিন আগেই টাইগার হিল (নাকি মানিকতলা বাজার !) থেকে সূর্য্যদোয় দেখেছি, যার সঙ্গে আজকের কোনো তুলনাই চলেনা । জাস্ট অভুতপুর্ব, মনোহারিণী এক সূর্য্যদোয় এর স্বাক্ষী হলাম, যা ভাষায় বর্ণনা করা আমার কম্ম নয়। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে আপনাকে ছুটে অন্য কোথাও যেতে হবে না, ঘাড়টা ৯০ ডিগ্রী বাঁদিকে ঘোরালেই রক্তিম শিখর আপনাকে নিজেই ধরা দেবে। উফফফফফফ্  কি সেই আদিম সৌন্দর্য । শুধু এইটুকু বলতে পারি টাইগার হিলকে বলে বলে ১২ গোল দেবে । সেই নির্জন টাওয়ার এর ওপর একা দাঁড়িয়ে, গলা ছেড়ে “আলো আমার আলো ওগো আলো ভুবনভরা ” কিম্বা “আলোকের এই ঝর্ণাধারায়” স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেড়িয়ে আসবেই।

কটেজে ফিরে, চা বিস্কুট খেয়ে, বিনোদজীর সঙ্গে বেরোলাম জঙ্গল সাফারিতে
সরু পায়ে চলা পথে, দুপাশে নুয়ে পরা সবুজ সরাতে সরাতে পৌঁছে গেলাম ছোট্ট একটা জলাশয়ের পাশে । এটাকে এরা পোখরি বলে, মানে পুকুর বা পুষ্করিণী, যেখানে আকছার বন্যরা তেষ্টা মেটাতে আসে । আশেপাশে চিতার পায়ের ছাপ  চাক্ষুষ করলাম এবং তার সাথে পথের পাশে ফলে থাকা জংলি স্ট্রবেরীর স্বাদও জিভে নিলাম । আমাদের চারপাশেই ঘন সবুজ জঙ্গল সঙ্গে উপরি পাওনা বিনোদজীর মতো সদা সতর্ক অমাইক এক গাইড, তবুও গা ছমছম করছিলো ।
হাতে সময় কম, আর সাথে আমার সাড়ে তিন বছরের মেয়ে থাকায় (সে সারাক্ষন সুর করে “জঙ্গলে বাঘ আছে” গাইতে গাইতে adventure এর মুডে ছিলো) আমাদের bird watching programme টা cancel করতে হলো ।হাতে আর একটা রাত সময় থাকলে Rambi forest এ jeep এ night safari টাও করা যেত…….
কিন্তু, এবার থামতেই হবে, বিনোদজীর অফার করা (এই অফার ফেরালে জীবনে এক স্বর্গীয় স্বাদ থেকে বঞ্চিতই থেকে যেতাম) গরম থুপ্পা খেয়ে, চটকপুরকে “আবার আসবো” বলে বিদায় জানিয়ে, আমরা ফেরার পথ ধরলাম।।

পুনশ্চ :
১) সারা বছরই যেতে পারেন, বছরের বিভিন্ন সময়ে পাহাড় জংগল এর আলাদা রুপ দেখতে পাবেন। তবে অন্ততপক্ষে দুরাত্রির থাকতে পারলে ভালো হয়।
২)ফরেস্ট বাংলোতে থাকা খাওয়া নিয়ে ৪০০০/২জন, ৫০০০/৩জন, wbfdc.com থেকে বুকিং করতে পারেন, আমি windoz থেকে বুকিং করেছিলাম, no extra cost, 8972247306 নাম্বারে ফোন করবেন।
হোম স্টের জন্যে বিনোদ জি কে ফোন করতে হবে, নাম্বার 07583971517, এছাড়াও একাধিক হোম স্টে আছে, তবে জেনে নেবেন attached bath আছে কিনা।
৩) শিলিগুড়ি / njp থেকে গাড়িভাড়া ২৮০০/৩৫০০ তবে দরদাম করতে হবে। আর অবশ্যই একটু উঁচু গাড়ি নেবেন, রাস্তা খুব খারাপ। দার্জিলিং থেকেও ওইরকমই ভাড়া, ফেরার সময়ে বিনোদজির গাড়ি আছে। প্রসঙ্গত জানাই বিনোদজী ফরেস্ট বাংলোর কেয়ারটেকার।

Must Read

বাঁকিপুটের বালুকাবেলায়

Uttal Chakroborty

ঘরের কাছেই আরশিনগর

Madhumita Ghosh

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More