Samachar Live
সফর

বাঁকিপুটের বালুকাবেলায়

যেমন হিমালয়ের হিমেল হাওয়ায় শরীরের সব ক্লান্তি উবে যায়, মনটা কেমন একটা প্রশান্তি লাভ করে, ঠিক তেমনি সমুদ্রের জলে পায়ের পাতা ডোবালেই যেন শরীরের সমস্ত ক্লেদ দূর হয়ে যায়. যেন নতুন করে রিচার্জ হয়ে যাওয়া যায় আগামী দৈনন্দিনতার জন্যে.

ধুস কোনটা যে বেশী ভালো লাগে, পাহাড় না  সমুদ্র, আমরা নিজেরাই বুঝিনা !

কিন্তু দিন দুয়েকের জন্যে শহুরে কোলাহল ছেড়ে কোথায় যাওয়া যায় ?

সেই জায়গা খোঁজার দায়ীত্বটা আমার ওপরই বর্তেছে ।

নানান ভ্রমণকাহিনী পড়ে ঠিক করলাম বরন্তি অযোধ্যা পাহাড়ই ঘুরে আসি। এদিকে মনটা কেমন সমুদ্র দেখার জন্যে আকুপাকু করছে, অথচ ভিড়ভাট্টা এড়াতে চাইছে, তাই অল টাইম ফেভারিট দীঘাকে বাদ দিয়ে তাজপুর, মন্দারমনি, বকখালি সব বাতিল করে দুদিনের জন্যে বাঁকিপুটের ঝিনুক রেসিডেন্সীর তিনটে ঘর বুক করে ফেললাম। মনে বড়ো দোটানা আমার সহধর্মিণী আর আমার দুই বন্ধু আর তাদের পরিবারের সদস্যদের ভালো লাগবে তো?

     নির্ধারিত দিনে হৈ হৈ করে আমরা চেপে পরলাম ডাউন কাণ্ডারি এক্সপ্রেসে, সারা ট্রেনে ট্যুরিস্ট ভর্তি, সবার গন্তব্য দীঘা৷ বেশ মজা করেই আমরাও চলেছি, কোলাঘাট পেরোতেই রেল লাইনের দুপাশের দৃশ্য বদলাতে থাকে, সবার চেনা সেই ছবি…

কিন্তু সেই ধানের ক্ষেতের মাঝে মাঝে ছুটে চলা পানের বরজ দেখতে বড়ো ভালো লাগে । শেষ বিকেলের পড়ন্ত আলোয় আমরা নেমে পরলাম কাঁথি ষ্টেশনে, আমরা কজন আর কিছু ডেলি প্যাসেঞ্জারকে নামিয়ে হুইসল বাজিয়ে ট্রেনটা হারিয়ে গেলো পশ্চিমাকাশের লাল সূর্য্যের পানে…

প্লাটফর্ম ছেড়ে বাইরে এলাম, গাড়ী বলা ছিলো, কিন্তু সে আসার আগেই বাইরের চত্বর খালি হয়ে গেলো, যে কটা টোটো অটো দাঁড়িয়ে ছিলো সব নিমেষে কোথায় যেন চলে গেলো, সুয্যিমামা ততক্ষনে পাটে গেছেন, সন্ধ্যা নামার আগের চুরি করা শেষ বিকেলের আলো কে হেড লাইটের আলোয় ঝলসে দিয়ে আমাদের বাহন এসে পরলো, বামাল সমেত আমরা উঠে পরলাম, আধঘণ্টার মধ্যেই কাথি শহরের মধ্যে দিয়ে এসে জুনপুট মোড় থেকে বাঁধের রাস্তা ধরে ঝিঝি ডাকা সন্ধ্যায় পৌঁছে গেলাম এক নিঝুম অন্ধকার জড়ানো বাকিপুটের ঝিনুক রেসিডেন্সীতে, আশেপাশে কোথাও সমুদ্র আছে বলে মনে হলো না, মনটা বড়ো ছটফট করতে লাগলো, এইরে এ কোথায় আমি নিয়ে এলাম এদের !! কপালে আমার দু:খ আছে….

যাইহোক, ঊষ্ণ আপ্যায়নে মন কিছুটা হাল্কা হলো, তারপর গরম চিকেন পকোড়া আর পেঁয়াজি সহযোগে ধুমায়িত কফির কাপ হাতে মনে বেশ বল পেলাম। লনে দাঁড়িয়ে খানিক আকাশ দেখলাম, এতো বড়ো আকাশ, আকাশময় এতো নক্ষত্র দেখার সুযোগ আর হয় কোথায়… এক ফাঁকে কোনের ওয়াচ টাওয়ারে উঠেও খানিক সমুদ্র খোঁজার চেস্টা করলাম… 🙁 পেলাম না । খানিক আড্ডা মেরে, রাত্রে দেশী মুরগীর সুস্বাদু ঝোল ভাত খেয়ে, কালকের সূর্য্যোদয়ের সময়টা সকলকে জানিয়ে শুতে গেলাম।

ছটা বাজার আগেই ঘুম ভেঙে গেলো, নিজে তৈরী হয়ে, সবাইকে ডেকে বাইরে এলাম, তখনও বেশ কিছুটা দেরী আছে সূর্য্যদোয়ের। হোটেলের খিরকি দরজা দিয়ে বাইরে বেড়িয়ে, একটা ছোট্ট ঝাউবন পেড়িয়ে, সামনে যা দেখলাম, মন খুশ…. সমুদ্র আশেপাশে নেই ঠিকই, কিন্তু আদিগন্ত বিস্তৃত এমন বালুকাবেলা আমি আগে কখনো দেখিনি… যেদিকে যতদুর চোখ যায় ধু ধু বালুরাশি, আর সেই অনন্ত বেলাভূমিতে শুধু আমরা কজন। পূর্বদিগন্তে ততক্ষনে তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে, সূয্যিমামা দিগন্তে হালকা মেঘের ঘোমটা সরিয়ে অল্প উকি দিয়ে দেখে নিয়েই, সারা বেলাভূমিতে এক অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে দিলেন, তারপর আমাদের নানারকম ভাবে ছবি তোলার সুযোগ দিতে দিতে ধীরে ধীরে মুখ তুলে চাইলেন। উফ্ কি আদিম সেই দৃশ্য… ভাষায় যা বর্ণনা করা আমার কম্ম নয় । চরাচর জুড়ে সেই নিঝুম পুরীতে বালুকা বেলার উপর তার প্রথম আলো পরতেই আমাদের সবার মনটা কেমন অনাবিল আনন্দে ভরে উঠলো, আমার মনের যাবতীয় কালো নিমেষে ধুয়ে গেলো । সেই অনন্ত বালুরাশির মাঝে ধু ধু হাওয়ায় সূর্য্যের সোনালি আদর লেগে কেমন এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি হলো। লালের পরে সূর্য্যের হলুদ আলো এসে বেলাভূমিতে পরতেই হাজার রকমের আলপনা ফুটে উঠলো বালির বুকে, সে এক স্বপ্নিল দৃশ্য….

আলো ভালো করে ফোটার পর, দূরে দিগন্তরেখায় সমুদ্র নজরে এলো । না এখানে সমুদ্রে পা ভেজানোর কোনো গল্প নেই, অমাবস্যা পুর্ণিমার ভরা কোটালে এখানে জল আসে, ষাঁড়াষাঁড়ির বানে বাঁধানো পাড়ের বোল্ডারে ভাঙনও ধরায়, কিন্তু, অন্য সময়ে দিনে দুবার জোয়ারে পায়ের পাতা ভেজানো জল কোথাও কোথাও আসে, আর তাই বেলাভুমির কোনো কোনো জায়গায় প্রচুর কাদা, একটু বেলা হলে, শুধুমাত্র জেলেদের পায়ে চলা পথ দিয়েই সমুদ্রের দিকে যাওয়া যেতে পারে ।

হোটেলে ফিরে জলখাবার সেরে, আবার আমাদের বালুকা সফর শুরু করলাম। কাদা মানে কোথাও কোথাও প্রচুর কাদা, আমার মতো ফেদার ওয়েট তো সবাই নয়, একদম চটচটে হাটু ডোবা কাদায় ফেঁসে যাবার চান্স আছে । সবার পক্ষে সেই কাদা পার হওয়া সম্ভব নয়, তাই আমরা দুই বন্ধু সেই কাদার পথে এক জেলের পেছন পেছন এগিয়ে চললাম, পথে একটি অগভীর নালা আছে, জোয়ারের সময় সেখান দিয়েই বেশী জল আসে, জেলেদের বড়ো বড়ো নৌকা সেই পথেই আসা যাওয়া করে, এখন সেখানে এক হাটু জল, সেটা পার হয়ে আরো কিছুটা কাদাপথ পেরিয়েই আবার শুকনো বেলাভূমি । সেই নিঝুম শান্ত চরাচরে শুধু আমরা দুজনে হাঁটছি, পেছনে অনেক দূরে আমাদের বাকি সাথীদের দেখা যাচ্ছে আর সামনে দিগন্তরেখায় কয়েকজন জেলে, আরো খানিকটা কাদাপথ পার হয়ে সেই জেলেদের কাছে পৌঁছলাম। প্রায় আধঘন্টা হেটে আমরা এখানে এলাম, সমুদ্রে পা ভেজাতে আরো অন্তত এইরকমই পথ যেতে হবে । আর সে পথেও কোথাও কাদা, কোথাও বালি, জেলেদের পায়ে চলা পথ সর্বত্র খুঁজে পাওয়াও কঠিন, তাই আর না এগিয়ে কিছু ফোটোসেশন করে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম । ফেরার পথে দেখলাম বালুকাবেলার এক বিস্তৃর্ণ অঞ্চল জুড়ে ম্যানগ্রোভের চারা লাগানোর কাজ চলছে, তার মানে কয়েক বছর পর এই জায়গাটার চেহারাটাই বদলে যাবে, আরো সুন্দরী হয়ে উঠবে বাঁকিপুটের এই বেলাভূমি, তবে ঝিনুক রেসিডেন্সীর পাশাপাশি আরো দুএকটি হোটেলও তৈরী হচ্ছে, তাই কয়েকবছর পর এই নির্জনতাও আর থাকবে না।

দুপুরে জমিয়ে ভেটকি সহযোগে লাঞ্চ সেরে আবার বেড়িয়ে পরা, গাড়ী এসে দাঁড়িয়েই ছিলো, শুধু ওঠার অপেক্ষা, বাঁধের ওপরের কাঁচা রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম বৃটিশ আমলের দরিয়াপুর লাইটহাউসে । তিনটের সময় খুলবে, তাই মিনিট পনেরো অপেক্ষা, ১০টাকা করে টিকিট, ক্যামেরা ২০টাকা, ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলাম, খুব বেশী উঁচু নয় তবে, ওপর থেকে চারিদিকটা বেশ লাগে৷ ওপরে ওঠার এই এক মজা, নিচের সবকিছুই ওপর থেকে বড়ো সুন্দর লাগে, যদিও এখান থেকে সমুদ্র দেখা যায়না, তবে চারিদিকের সবুজ প্রকৃতি দেখে সুন্দরবনের ওয়াচটাওয়ার গুলোর কথা মনে পরে গেলো৷ ওপরে বাচ্ছাদের একটু সাবধানে খেয়াল রাখতে হবে, কারণ রেলিঙ এর ফাকা গুলো খুব বেশী । নেমে এসে আবার চলা, এরপর পেটোয়াঘাট মৎস্যবন্দর৷ চতুর্দিক মাছের গন্ধে ভরপুর সাথে শুটকির গন্ধও মিশে আছে, এখানে শুটকি মাছ খুব পাওয়া যায় বটে৷ অনেক মাছ ধরার বোট দাঁড়িয়ে আছে, বেশ ছবির মতো লাগছে, একটির ওপর চড়ে খানিক ফোটোসেশনও হলো । পরবর্তী গন্তব্য বাবা সাহেবের মাজার, তবে সেখানে যেতে হলে ভুটভুটি নৌকায় ফেরী পার হতে হবে, ওপারে গিয়ে মিনিট দশেক হেঁটেই সেই মাজার। যদিও টোটো পাওয়া যায়, কিন্তু সবুজের প্রেক্ষাপটে ওই লাল মেঠো আঁকাবাঁকা পথে হাটার লোভ সামলানো গেলোনা৷ এই মাজারের ঠিক বাইরে একটা বিশাল বড়ো আর ভারী তরবারি আছে, সেটা দুহাত দিয়ে তুলতে পারলে নাকি মনষ্কামনা পুর্ণ হয়, (আমি অবশ্য সেই চেষ্টা করে লোক হাসাই নি 😉 )। এখানে ভগবতী দেবীর বহু পুরোনো একটি মন্দিরও দর্শন করলাম৷ মনটা বড়ো চা চা করছিলো, এক গুমটিতে অমৃত সমান চা খেয়ে, আবার ঘাটে ফিরলাম৷ সূর্য্যাস্তের আলোয় তখন সেই ঘাট, জল, আকাশ, সবুজ প্রকৃতি সব কেমন মায়াময় হয়ে আছে, ওই পরিবেশে ফেরী পার হতে দুর্দান্ত লাগলো । এরপর আজকের শেষ গন্তব্য বঙ্কিমচন্দ্রখ্যাত কপালকুন্ডলা মন্দির। চাইলে এই মন্দিরটি একদম প্রথমেই দেখে নেওয়া যায়, দরিয়াপুর লাইটহাউসের কাছেই মন্দিরটি৷ আমরা যখন পৌঁছলাম ততক্ষনে সন্ধ্যা নেমে গেছে, স্থানীয় একটি পরিবার মন্দিরটি দেখাশোনা করে, তাদেরই একজন হ্যারিকেন নিয়ে মন্দিরের দরজার তালা খুললেন৷ মন্দিরে কোনো মুর্তি নেই, সেটি নাকি বৃটিশরা ঝেড়ে দিয়েছে, তবে সেই সন্ধ্যার অন্ধকারে মন্দির চত্বরে ঢুকে শরীরে একটা শিহরন খেলে গেলো বৈকি…

ঝিনুকে ফিরে, গরম পকোড়া আর মাছ ভাজা সহকারে ধুমায়িত চা… আহা… তারপর এক আকাশ তারার চাঁদোয়ার নীচে বসে তুমুল আড্ডা৷ নক্ষত্রের আলোয় ওয়াচ টাওয়ারের ওপর বসে আড্ডা দিতেও বেশ লাগছিলো, এরপর রাত্রে খাসীর ঝোল ভাত খেয়ে ঘুমের দেশে ।

পরদিন সকালে বেলাভূমির দিকে না গিয়ে প্রথমে একাই একটু গ্রামের মেঠো পথ ধরলাম৷ দুদিকে পানের বরজ আর ধানজমি খুঁড়ে সেখানে পাম্পের সাহায্যে সমুদ্রের নোনা জল ভরে বাগদা চিংড়ি চাষের বড়ো বড়ো পুকুর, নানান পাখপাখালির ওড়াউড়ি…. বেশ লাগছিলো সকালের মিষ্টি আলোয় আপন খেয়ালে হাঁটতে, এদিক সেদিক ঘুরে বাঁধ পার হয়ে আবার বেলাভূমিতেই চলে এলাম৷ আজ বেশ ভিজে আর কাদাও বেশী, মানে রাত্রে জল এসেছিলো এইদিকে, এই জায়গাটা আমাদের হোটেল থেকে অনেকটাই দূরে। হোটেলের দিকেই চলতে লাগলাম, দূরে দেখলাম সেই খাঁড়িতে তিনটে বড়ো নৌকা দাঁড়িয়ে আছে, একটি ট্রাক্টরে কোনো কিছু আনলোডিং হচ্ছে, একটু কাছে গিয়ে জিগেস করে জানলাম শুটকি মাছ। ওদিকের কোনো এক দ্বীপে এই মাছ শুকোনো হয়, তারপর নৌকো করে তা এখানে আসে । ফিরে এলাম ঝিনুকে, আজ ফেরার পালা । সমুদ্রের এতো কাছে এসে সমুদ্রে একটু পায়ের পাতা ভেজানো হবে না !! সবার সিদ্ধান্ত হলো ফেরার পথে মন্দারমনি হয়ে কাথি স্টেশন যাবো । বড়ো বড়ো বাগদা সহযোগে দ্বিপ্রাহরিক আহার সেরে সোজা ৩০ কিমি পাড়ি দিয়ে মন্দারমনির বেলাভূমি, সেখানে ঘন্টা দুয়েক নোনা হাওয়া আর নোনা জলে হুড়োহুড়ি, মন্দারমনির বেলাভূমিতে রঙিন সূর্য্যাস্তের স্বাক্ষী হয়ে, ফেরার পথ ধরলাম। চলো মন নিজ নিকেতন।।

পুনশ্চ:  সবরকমের গাড়ির ব্যবস্থা ঝিনুক কতৃপক্ষই করে দিয়েছিলেন, ভাড়া নির্দিষ্ট কিছু নেই, দরাদরিতে ঠিক করতে হবে, আর ঝিনুকের ভাড়া ১২০০ টাকা ননএসি রুম। খাওয়া দাওয়া আলাদা, ওদের নিজস্ব রেস্টুরেন্ট, যেমন খাবেন তেমন দাম।

Must Read

চমৎকার চটকপুর

Uttal Chakroborty

ঘরের কাছেই আরশিনগর

Madhumita Ghosh

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More