Samachar Live

কি ভাবছ খুড়ো এই গঙ্গার ধারে বসে বসে? নিঃস্তব্ধ তপ্ত দুপুরে যখন সবাই ঘরে বসে এয়ারকন্ডিশনের হাওয়া খাচ্ছে তখন তুমি এখানে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে কি কবিতা লিখছো?’ নিখিলের কথাগুলো যেন অমৃতলাল শুনতেই পেলো না। শুধু আপন মনে বলে চলেছে—

“শত সহস্র বছর ধরে
বহিয়া চলেছো তুমি
অনন্ত পথ…
হিমালয় থেকে সাগরে।
পঙ্কিল তুমি ন‌ও
তবু পঙ্কিল করছে তোমায়
চেতনাহীন অমানুষেরা
পাহাড় সম নিক্ষেপিত
বর্জ‍্যের সমাহারে।।”

অমৃতলাল সাড়া দিচ্ছে না দেখে নিখিল আর একটু খচিয়ে দিয়ে আবার বললো খুড়িমার সঙ্গে কিছু হলো নাকি? খুড়িমার সঙ্গে কিছু হলেই তো তোমার মুখ দিয়ে কবিতা বেরোয় আর এমন এমন চিন্তা বেরোয় যেগুলো সাতজন্মে কেউ ভাবতে পারে না।দাও একটা বিড়ি দাও তো খুড়ো একটু টান দিই। অমৃতলাল বিড়ির প‍্যাকেটটা নিখিলকে দিয়ে বললো নে একটাই ধরা, শেষ টানটা যেন আমাকে দিস।—-

অমৃতলাল হলো ব‍্যারাকপুরের বোসপাড়ার নামকরা ফ‍্যামিলির ছেলে। নিখিল‌ও ওই এক‌ই পাড়ার ছেলে। বয়সে কিছুটা ছোট হলেও অমৃতলালের সঙ্গে জমে ভালো। পড়াশোনায় খুব ভালো অমৃতলাল সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে বহুদিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কিভাবে গঙ্গাকে দূষনমুক্ত করা যায়। বাবা মা জোর করে বিয়ে দিলেও এই আধক্ষেপা অমৃতলালের সংসারে কোনদিন মন‌ই বসেনি। শুধুই এদিক ওদিক ছোটাছুটি। ফাইলের পর ফাইলের পিটিশন,তার উত্তর আবার পিটিশন। ফারাক্কা থেকে আরম্ভ করে সুন্দরবন পর্যন্ত শুধু ছোটাছুটি করেছে। সব মানুষকে বুঝিয়েছে তোমরা এভাবে গঙ্গাকে শেষ করে  দিও না।বন্ধ কর তোমাদের বর্জ্য নিক্ষেপন। কে কার কথা শোনে।

খুড়িমা মানে অমৃতলালের স্ত্রী এখন এটা মেনে নিয়েছে। সে আগে বাধা দিতো,কিন্তু এখন মেনে নিয়েছে কারণ অমৃতলালকে ধরেবেঁধে রাখলে ওর শরীর বেশী খারাপ হয়। ছোটবেলায় যখন গঙ্গার ধারে অমৃতলাল আসতো তখনও ব‍্যারাকপুরে গঙ্গায় এত চড়া পড়েনি। এখানে চড়া পড়ার পেছনে পলি অধঃক্ষেপন একমাত্র দায়ী নয় তারসঙ্গে বর্জ্য নিক্ষেপণের ফলে জলধারার গতি প্রতি পদে পদে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। শিল্পের বর্জ্য তো আছেই তারসঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ভাবে গৃহস্থলী তথা মিউনিসিপ্যাল বর্জ‍্যের ফলে ধীরে ধীরে জলজ বাস্তুতন্ত্রের উপর বিরুপ প্রভাব ও বিষক্রিয়া। হিসাব করে দেখা গেছে উৎস থেকে সাগর পর্যন্ত গঙ্গার দূষণ সবথেকে বেশী এই ব‍্যারাকপুর থেকে হাওড়া পর্যন্ত। গঙ্গার এখানকার জলে কলিফার্ম ব‍্যাকটেরিয়ার পরিমাণ দু’ লক্ষ‍্যের কাছাকাছি। যেখানে একশ মিলিলিটার জলে কলিফার্ম ব‍্যাকটেরিয়া পাঁচ হাজারের উপর থাকলে জল দূষিত বলে মেনে নেওয়া হয় সেখানে দু-লক্ষ‍্য!! আর যদি কলিফার্ম- এর পরিমান ত্রিশ এর কাছাকাছি থাকে তবে পানীয় হিসাবে ব‍্যবহার করা যেতে পারে। শুধু কলিফার্ম ব‍্যাকটেরিয়া নয় এখানকার জলে দিন দিন দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমছে! এক লিটার জলে ছয় মিলিগ্ৰাম দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকলে সেটাকে স্বাভাবিক বলা হয়। এর কম মানেই দূষণ। গঙ্গার এখানে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ প্রতি লিটারে তিন বা চার মিলিগ্ৰাম!! স্বাভাবিকের থেকে অনেক কমে গেছে। এই দূষণের প্রকোপে ছোট ছোট মাছেদের অবস্থা সঙ্কটজনক। ছোট মাছ থেকে বড় মাছ সেখান থেকে মানুষ এইভাবে বায়ো ম‍্যাগনিফিসনের ফলে এই দূষণের বিষ বাড়তে বাড়তে খাদ‍্য খাদ‍্যকের সর্বোচ্চ স্তরে!

আজ যেন গঙ্গাকে চেনাই যায় না। পঞ্চাশ বছরে গঙ্গার আমুল পরিবর্ত্তন।মনে হচ্ছে কেউ যেন জোর করে  নদীকে বৃদ্ধ বানিয়ে দিলো। বহু চেষ্টা করে অনেক কাঠ খড় পুড়িয়েও অমৃতলাল মানুষকে শোধরাতে পারেনি। আর একা একা কত করবে!পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ, ক‍্যালকাটা কর্পোরেশন, অনান‍্য কর্পোরেশন ও মিউনিসিপ‍্যালিটি, ফারাক্কা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, গঙ্গার এপারে ওপারে যত কল কারখানা আছে সব জায়গায় অমৃতলাল গেছে  এই পঞ্চাশ বছরে।বলেছে তোমরা শুধু নিজের দিকটা দেখো না। পৃথিবীকে ভবিষ‍্যতের বাসযোগ‍্য করে তোলার জন‍্য আর শিশুদের নিঃশ্বাস নেওয়ার জন‍্য একটু হাত বাড়াও নাহলে অচিরেই সব ধ্বংস হয়ে যাবে। কে এই আধক্ষেপার কথা শোনে।

এখন শরীরের তেজ কমে গেছে।বয়স পঁচাত্তরের কাছাকাছি। আর ছোটাছুটি করতে পারে না।তাই রাতদিন এই গঙ্গার ধারে বসে থাকে।শুধুই এখন অনুশোচনা।কিছুই করতে পারলাম না জীবনে।আসলে অমৃতলালের কাছে গঙ্গা একমাত্র ছেলে আর গঙ্গা একমাত্র মেয়ে।চোখের সামনে ছেলে মেয়ের এই ভয়ানক পরিস্থিতি দেখে অমৃতলালের আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না।

মন খারাপ হলে অমৃতলাল নদীর ধারে চলে আসে। একটু নীরবে নিভৃতে সময় কাটাবার জন‍্য। এলোমেলো অবিনস্ত লম্বা চুল মাথা থেকে কপাল ছুঁয়ে মুখ ঢেকে গেছে। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা আর পরনে হাওয়াই শার্ট ও প‍্যান্ট। আজও সেই মন খারাপের পালা। বিড়ির শেষ টানটা দিতে দিতে অমৃতলাল নিখিলকে বললো-

‘বুঝলি নিখিল ভাবছি আবার ফিরে যাবো উজানের দিকে।’

নিখিল বললো ‘  উজানের দিকে? ব‍্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না। নদীর উজানের দিকে? মানে তুমি সেই উৎসের দিকে যেতে চাইছ? অহ্ বুঝেছি, মানে তোমার আর বাঁচতে ইচ্ছা করছে না তাইতো? তুমি তো একেবারে দেখছি আর্ট ফিল্মের মতো কথা বলছো।’

‘আরে বাবা নতুন জীবনের দিকে। নতুন জীবন যত সৃষ্টি হবে ততই মঙ্গল।বুড়োগুলো সব বজ্জাতের দল। পাকা মাথায় অর্থলোভে মসনদে বসে বুদ্ধি আঁটছে আর ধ্বংস করছে এই প্রাকৃতিক পরিবেশকে। আমার এই লড়াই জন্ম জন্মান্তরের লড়াই’।—–

  ‘নতুন জীবনের দিকে? ঠিক কি বলতে চাইছো তুমি? ‘

‘ আরে বাবা এই ছোট ব‍্যাপারটা বুঝলি না! এতদিন তো ছুটে এলাম শিশু থেকে বুড়োর দিকে মানে ভাটার টানে স্রোতের অনুকূলে এবার বুড়ো থেকে আবার শিশু। স্রোতের প্রতিকূলে সাগর থেকে উৎসে। উৎস তো হলো আধার। শান্তির জায়গা। নদী উৎসকে কি বলে জানিস? ধারণ অববাহিকা! মানে যিনি ধারণ করেন! মাতৃগর্ভ !!’

সেদিন‌ই অমৃতলাল ইহলোক ছেড়ে পরলোকে যাত্রা করে। জীবনের একটাই দুঃখ ছিল অমৃতলালের তার কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেলো। হয়তো গঙ্গা দূষণ কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে কিন্তু পুরোপুরি কমেনি। এই নিয়ন্ত্রনে অমৃতলালের ভূমিকা কতখানি তা ইতিহাস বলবে।কিন্তু মজার ব‍্যাপারটা হলো অমৃতলালের মৃত্যুর বছর সাতেক পরে হঠাৎ একদিন সকাল বেলায় বছর ত্রিশ বত্রিশের এক যুবক অমৃতলালের বাড়িতে। খুড়িমা তখনও জীবিত। খুড়িমা জিজ্ঞস করাতে সে বললো সে নাকি পূর্ব মেদিনীপুর থেকে আসছে।তার বছর ছয়েকের ছেলে তাকে রাতদিন জ্বালিয়ে খাচ্ছে সে ওখানে থাকবে না সে ব‍্যারাকপুরে যাবে!! ব‍্যারাকপুরে সে কোথায় যাবে, তার বাড়িটা কেমন,কোন ঘরে তার ফাইল আছে সব নাকি সে বলতে পারছে !!

ব‍্যরাকপুরের নাম ওই ছেলেটির বাবা মানে এই যুবকটি আগে কোনদিনই শোনেনি। কোথায় পূর্ব মেদিনীপুরের গ্ৰাম আর কোথায় উত্তর চব্বিশ পরগনা! তাছাড়া একেবারে নিম্ন মধ‍্যবিত্ত পরিবারে খেটে খাওয়া মানুষ। ছেলে ওখানে থাকবে না শুনে ওরা স্বামী স্ত্রী তো চোখের পাতা এক করতে পারে না। সবসময়ে ওরা ভাবে ছেলে মনে হয় এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে।

মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে আর ছেলের কথামতো সব কিছু লিখে নিয়ে আজ এখানে হাজির। খুড়িমা তো ছেলেটির কথা শুনে মূর্ছা যাওয়ার মতো। যেখানে যেখানে যা যা ফাইলের কথা সেই ছোট্ট ছেলেটি বলেছে সব মিলে গেলো।সব‌ই সেই গঙ্গা দূষণের ফাইল। জানিনা জাতিস্মরের কোন ধারণা আছে কিনা তবে অমৃতলালের মতো আধক্ষেপা সর্বত‍্যাগী সন্ন‍্যাসী মানুষেরা জন্ম জন্মান্তরে না জন্মালে গঙ্গা দূষণ কোনদিন প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।

          সমাপ্ত

Must Read

বিবাহ-বিচ্ছেদ – (মধুরিমা রায়)

Madhurima Ray

জিও বাঙালি

Sambuddha Chatterjee

ছায়া যুদ্ধ

Pubali Mukherjee

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More